পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের মাঝরাতে বাড়ি থেকে তুলে নিচ্ছে পুলিশ, ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে পাঠাচ্ছে ডিটেনশন সেন্টারে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

২৯ জুলাই ২০২৬। মধ্যরাতের পরপরই কলকাতা থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় নিজের বাড়িতে ফিরেছেন পারবিন খাতুন। রাত সাড়ে ১২টার রামাকান্তপুর গ্রামে তাদের বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ল একদল লোক।

পারবিন বলেন, ‘তারা আমার শ্বশুরের নাম ধরে ডাকছিল।’

পারবিন জানান, ৬১ বছর বয়সি ইব্রাহিম শেখ দরজা খুলতেই সাত-আটজনের একটি দল তাকে ঘিরে ধরে। লোকগুলো সাধারণ পোশাকে থাকলেও পারবিনের কাছে তাদের দেখে পুলিশ কর্মকর্তা বলেই মনে হচ্ছিল।

পারবিন বলেন, ‘তারা তার কাছে কাগজপত্র দেখতে চায়। তখন তিনি তাদের তার আধার ও ভোটার কার্ড দেখান।’ এরপর তারা তাকে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি কি ইন্ডিয়ান, না বাংলাদেশি?’

ইব্রাহিম বলেন, ভারতীয়, বাংলাদেশি নন। কিন্তু লোকগুলো জানায়, তাদের কাছে তথ্য আছে তিনি ভারতীয় নাগরিক নন।

পারবিন বলেন, এরপর তারা ইব্রাহিমের দুই হাত পেছনে চেপে ধরে যখন শারীরিকভাবে হেনস্তা করতে শুরু করে, তখন তিনি ‘প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যান’ এবং ‘পুলিশ যা বলছিল তার সবকিছুতেই “হ্যাঁ” বলতে থাকেন’।

এরপর লোকগুলো ইব্রাহিমকে বাংলাদেশি নাগরিক আখ্যা দিয়ে জোর করে তুলে নিয়ে যায়। ‘তারা আমাদের কোনো লিখিত কাগজ বা আমার শ্বশুরের বিরুদ্ধে পুলিশের কোনো অভিযোগপত্র দেখায়নি,’ বলেন পারবিন।

তিনি লোকগুলোকে ইব্রাহিমের বয়স ও অসুস্থতার কথা বিবেচনা করার অনুরোধ করেছিলেন। ‘কিন্তু তারা উল্টো তাকে নিয়ে হাসাহাসি করছিল।’

পরদিন ইব্রাহিমের পরিচয়পত্র, পেনশনের কাগজপত্র (যার তথ্যানুযায়ী তিনি মুর্শিদাবাদভিত্তিক কোম্পানি পতাকা বিড়ির কর্মী ছিলেন), ২০১৭ সালে তার নামে ইস্যু করা জমির দলিল, ভোটার কার্ডসহ আরও বেশ কিছু প্রমাণপত্র নিয়ে সুতি থানায় যান পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু তাদেরকে ইব্রাহিমের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি।

একদিন পর পুলিশ জানায়, তাকে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়েছে। পারবিন বলেন, ‘এরপর থেকে আমরা সুতি থানা, জঙ্গিপুরের পুলিশ সুপারের কার্যালয়সহ বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে ঘুরেছি। কিন্তু তিনি কোথায় আছেন আমরা জানি না। পুলিশ তাকে স্রেফ গুম করে ফেলেছে।’

‘গুম’

ইব্রাহিম শেখ একা নন। স্ক্রল-এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এ বছরের জুন থেকে অন্তত নয়জন মুসলিম পুরুষ ও দুটি শিশুকে বাংলাদেশি নাগরিক সন্দেহে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। এদের মধ্যে একজন বাদে বাকি সবার বাড়ি মুর্শিদাবাদে। কাউকেই নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ বা অভিযোগ খণ্ডনের সুযোগ দেওয়া হয়নি।

আটক হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত চারজন সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে পরিচালিত নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) প্রক্রিয়ার যাচাই-বাছাইয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। এ সংশোধনী প্রক্রিয়ায় নিজের নাম বাদ পড়ার বিরুদ্ধে ইব্রাহিম শেখ যে আপিল করেছিলেন, তা এখনো নির্বাচন কমিশন গঠিত ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে।

আটকের ঘটনাগুলোতে প্রায় একই প্যাটার্ন দেখা গেছে। বেশিরভাগ মানুষকেই মাঝরাতে এসে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে। একজনকে তো তার বাড়ির বাইরের বারান্দায় ঘুমানোর সময়ই তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরিবারের সদস্যরা জানান, কেন তাদের ধরে নেওয়া হচ্ছে, তার সপক্ষে পুলিশ কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, রিমান্ডের নির্দেশ অথবা ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্টের (এফআইআর) কোনো অনুলিপি দেখাতে পারেনি। কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, আটকের কয়েক সপ্তাহ পর পুলিশ স্বপ্রণোদিত হয়ে এফআইআর দায়ের করেছে।

পুলিশের নথিপত্র অনুযায়ী, অন্তত একটি ঘটনায় আটককৃতদের একজনকে দেশ থেকে বের করে দিতে পুলিশের একটি চেষ্টা ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ-ই প্রত্যাখ্যান করে দেয়।

গত বছরের মে থেকে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে পুলিশ পশ্চিমবঙ্গের বেশ কয়েকজন মুসলিম অভিবাসী শ্রমিককে তুলে নিয়ে গেছে। তারা বাংলাদেশি, এমন অভিযোগে বিএসএফ জোরপূর্বক তাদের বাংলাদেশে পুশ-ইন করেছে। অন্তত একটি ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তাদের আবার দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

কিন্তু এবারই প্রথম বাঙালি মুসলমানরা নিজ রাজ্যে এ ধরনের হয়রানি ও সন্দেহের মুখে পড়েছেন।

মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রটেকশন অভ ডেমোক্রেটিক রাইটসের সঙ্গে যুক্ত মুর্শিদাবাদের মানবাধিকারকর্মী জাকির হোসেন বলেন, ‘সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, পুলিশ নির্বিচারে মানুষকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। তারপর আদালতে হাজির না করেই তাদের ডিটেনশন সেন্টারে পাঠিয়ে দিচ্ছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি ও অসাংবিধানিক।’

মুখ্যমন্ত্রীর বিবৃতি

প্রতিকার চেয়ে ইব্রাহিম শেখের পরিবার আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে।

গত ২৫ আগস্ট ইব্রাহিমের ৮১ বছর বয়সি মা হানিফা বেওয়া কলকাতা হাইকোর্টে হেবিয়াস কর্পাস পিটিশন দায়ের করেন। তাতে তিনি রাজ্য সরকারকে ছেলের অবস্থান খুঁজে বের করে তাকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেওয়ার আর্জি জানান।

তবে রাজ্য সরকার দাবি করেছে, হানিফা ইব্রাহিমের জন্মদাত্রী মা নন।

ইব্রাহিমের আইনজীবী মো. নূর হোসেন জমাদার স্ক্রলকে বলেন, হানিফা ছিলেন ইব্রাহিমের খালা। তিনি ইব্রাহিমকে তাকে দত্তক নিয়েছিলেন। ‘তবুও এটি একটি বেআইনি আটক। কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও, পরিবারের কাছে তার অবস্থান সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। অ্যারেস্ট মেমো বা এফআইআর ছাড়া কাউকে এভাবে আটকে রাখা যায় না।’

নূর হোসেন বলেন, পরিবারটির কাছে ১৯৪৬ সালের জমির দলিল রয়েছে। এ থেকেই প্রমাণ হয়, তারা স্বাধীনতার আগে থেকেই ভারতে বসবাস করে আসছেন।

ইব্রাহিমের পরিবারের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সুতি থানার ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা অভিজিৎ বসু মল্লিক।

তিনি বলেন, ‘তারা দেশের আইন জানে না। সরকারের নির্বাহী আদেশ অনুযায়ীই এই আটক করা হয়েছে। এর জন্য কোনো এফআইআরের প্রয়োজন নেই।’

জঙ্গিপুরের পুলিশ সুপার সুরিন্দর সিংও একই দাবি করে বলেন, ‘গাইডলাইন মেনেই সবকিছু করা হয়েছে। পরিবারটি নিজেরাও জানে যে তারা বাংলাদেশি।’

আইনজীবী ও অধিকারকর্মীরা বলছেন, পুলিশের এই পদক্ষেপ সম্পূর্ণ অস্বচ্ছ; এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই।

বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চের কর্মী কিরীটি রায় বলেন, ‘এটি কোনো পুলিশি রাষ্ট্র নয়। কোনো ব্যক্তিকে আটক করা, তাকে বাংলাদেশি হিসেবে গণ্য করা এবং কোনো তদন্ত ছাড়াই তাদের পুশব্যাক করা বেআইনি।’

অধিকারকর্মীরা বলছেন, পুলিশের এই পদক্ষেপ গত মে মাসে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দেওয়া এক বিবৃতির ফলশ্রুতিতে নেওয়া হচ্ছে। শুভেন্দু বলেছিলেন, ‘রাজ্যে আটক হওয়া বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের আদালতে হাজির না করে সরাসরি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হবে ডিপোর্ট করার জন্য।’

শুভেন্দু আরও বলেছিলেন, ২০১৯ সালের নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইনের আওতায় যোগ্য হিন্দু অভিবাসীদের লক্ষ্যবস্তু করা হবে না।

পারবিন বলেন, যেসব পুলিশ কর্মকর্তা তার বাড়িতে এসেছিলেন, তারা সাম্প্রদায়িক কথাবার্তা বলছিলেন।

তার অভিযোগ, তিনি যখন ইব্রাহিমকে নিয়ে না যাওয়ার অনুরোধ করছিলেন, তখন ওই লোকগুলো বলেছিলেন, ‘হিন্দুরা আমাদের বুকে, মুসলমানরা আমাদের পায়ের তলায়।’

‘তারা আমাকে বলেছিল: “কাল যদি বাংলাদেশ থেকে হিন্দুরা আসে, তাদেরও আমরা ভারতীয় বানিয়ে নেব।”‘

‘সরকার বদলে গেছে’

গত ১৯ জুন মধ্যরাতে উত্তর দিনাজপুর জেলার বাহরাই গ্রামে নিজ বাড়ির বারান্দায় ঘুমাচ্ছিলেন ৬৭ বছর বয়সি জলিল আক্তার। ঠিক তখনই পুলিশ তাকে তুলে নিয়ে যায়।

তার স্ত্রী তৌফা বিবি স্ক্রলকে বলেন, ‘পুলিশ রাতে চোরের মতো এসে তাকে ধরে নিয়ে যায়। ঘুম থেকে উঠে তাকে দেখতে না পেয়ে তখন ভেবেছিলাম হয়তো ফজরের নামাজ পড়তে গেছেন। কিন্তু তিনি যখন আর ফিরলেন না, তখন আমরা খুব সকালেই তাকে খুঁজতে বের হই।’

জলিলের চাচাতো ভাই ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মতিউর রহমান খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, বাংলাদেশি সন্দেহে ডালখোলা থানার পুলিশ কর্মীরা তাকে তুলে নিয়ে গেছে।

মতিউর ও তৌফা বলেন, এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

রহমান জানান, ২০০২ ও ২০২৬ সালে পরিচালিত এসআইআরের পর প্রস্তুত করা ভোটার তালিকায় জলিলের নাম ছিল। এছাড়া জলিলের প্রপিতামহের (দাদার বাবা) নামেও তাদের জমির দলিল রয়েছে বলে জানান তৌফা।

মতিউর বলেন, ‘আমরা যখন থানায় গিয়ে জানতে চাইলাম ওকে কেন তুলে আনা হয়েছে, এসআইআরে তো ওর নাম যাচাইয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে, তখন তারা বলল, “আপনারা এখন আমাদের সাথে তর্ক করতে পারেন না। সরকার বদলে গেছে, কোনো তর্ক চলবে না”।’

পরে ইসলামপুর জেলে জলিলের সাথে দেখা করা মতিউর বলেন, পুলিশ তাকে ‘অপহরণ’ করেছিল। ‘ও আমাকে বলেছে, ওকে ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে রাখা হয়েছিল।’

হেফাজতে নেওয়ার এক মাস পর আক্তারের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করে তাকে আদালতে হাজির করা হয়।

১ আগস্ট উত্তর দিনাজপুর আদালতে ডালখোলা পুলিশের দাখিল করা প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই চার সপ্তাহের মধ্যে পুলিশ অন্তত একবার তাকে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আক্তারকে নিজামপুরের একটি অস্থায়ী হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয়েছিল ‘এবং তার বায়োমেট্রিক ও ডিপোর্টেশএন্র সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়েছিল’। তাকে ৪ জুলাই বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়।

কিন্তু অলিল জোর দিয়ে বলতে থাকেন, তিনি একজন ভারতীয় নাগরিক। স্ক্রলের দেখা ডালখোলা পুলিশের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এর ফলে বিএসএফ তাকে পুনরায় পুলিশ হেফাজতে ফেরত পাঠায়।’

তাকে পুশব্যাক করতে না পেরে পুলিশ এরপর ২০২৫ সালের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্টের অধীনে তার বিরুদ্ধে স্বপ্রণোদিত মামলা দায়ের করে। এতে তার বিরুদ্ধে বৈধ পাসপোর্ট, ভ্রমণের কাগজপত্র বা ভিসা ছাড়া দেশে প্রবেশকারী বিদেশি হওয়ার অভিযোগ আনা হয়।

জলিলের পরিবারের সদস্যরা জানান, তারা ১৯৬৭ সালের জমির দলিল জমা দিয়েছেন। ওই দলিল জলিলের বাবা রওশন আলীর নামে ছিল। কিন্তু পুলিশ তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, জলিল রওশন আলীর ছেলে, তা প্রমাণ করার মতো কোনো দালিলিক প্রমাণ তিনি উপস্থাপন করতে পারেননি।

পুলিশ বলেছে, কয়েক দশক ধরে উত্তর দিনাজপুরে বসবাস করার দাবি করলেও জলিল বাংলায় কথা বলতে পারতেন না।

আক্তারের পরিবার সুরজাপুরী ভাষায় কথা বলে। এটি হিন্দি, মৈথিলি ও বাংলা ভাষার একটি মিশ্রণ। মূলত বিহার-পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত অঞ্চল ও জলিলের নিজ এলাকা উত্তর দিনাজপুর জেলার ইসলামপুর মহকুমায় এই ভাষার প্রচলন রয়েছে। ইসলামপুরের তিন লাখের বেশি মানুষ সুরজাপুরীকে মাতৃভাষা হিসেবে নিবন্ধন করেছেন।

মতিউরের অভিযোগ, পুলিশ কোনো ভিত্তি ছাড়াই মুসলমানদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে। ‘তারা আমাকে বলেছিল: “আমরা তো সবে শুরু করেছি। আমাদের তালিকায় ৫০০ জনের নাম আছে।”‘

‘একটি পরিবার ভেঙে দিয়েছে’

ইব্রাহিম শেখকে তুলে নেওয়ার এগারো দিন পর, মধ্যরাতে সুতি থানার পুলিশ তিন কিলোমিটার দূরের নূরপুরদিয়া গ্রামের একটি বাড়িতে হাজির হয়।

রাত সাড়ে ১২টার দিকে সাত-আটজন পুলিশ সদস্য জামিরুল শেখের দরজায় কড়া নেয়ে তার দত্তক নেওয়া ছেলে আব্দুল জব্বারের খোঁজ করেন।

জমিরুল বলেন, ‘পুলিশ দাবি করেছে, ও বাংলাদেশি। এরপর ওকে ধরে নিয়ে যায়। কিন্তু আমি ২৬ বছর আগে জব্বারকে ওর নানা-নানির কাছ থেকে দত্তক নিয়েছিলাম।’

জব্বারের দুই ছেলে—আট বছর বয়সি আহাদ ও ছয় বছর বয়সি জিয়াদকেও তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তার তৃতীয় সন্তান, ১১ মাস বয়সী আব্দুল হালিম তার স্ত্রীর কাছে রয়েছে।

জামিরুল বলেন, ‘ওরা একটি পরিবার ভেঙে দিয়েছে।’

পুলিশ কর্মকর্তারা জমিরুলকে জব্বারের কাগজপত্র নিয়ে থানায় যেতে বলেছিলেন। ‘তারা বলেছিল, ওকে ছেড়ে দেবে। কিন্তু পরেদিন ওর সাথে দেখাই করতে দেয়নি আমাদের।’

উল্টো পুলিশ কর্মকর্তারা জমিরুলকে ২০২২ সালে ইস্যু করা একটি বাংলাদেশি জন্মনিবন্ধন সনদ দেখিয়ে দাবি করেন, জব্বার বাংলাদেশি। শেখ বলেন, ‘ওটা ভুয়া দলিল।’

তিনি বলেন, জব্বারের কাছে ভারতীয় পাসপোর্ট, নূপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের সাব-রেজিস্ট্রারের ইস্যু করা জন্মনিবন্ধন সনদ ও ভোটার কার্ডসহ কয়েকটি নথি রয়েছে। স্ক্রল এসব নথি দেখেছে।

পশ্চিমবঙ্গের এসআইআরে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় জব্বার গত বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন।

জামিরুল স্ক্রলকে বলেন, ‘ও ভারতীয়, ওর মা-ও ভারতীয়। ওর মা স্বামীর (তিনি বাংলাদেশি) সাথে দেশ ছাড়ার পর আমরা ওকে দত্তক নিই।’

মুর্শিদাবাদের অধিকারকর্মী জাকির হোসেন বলেন, ১৯৯০-এর দশকে সীমান্তের দুই পারের পরিবারগুলোর মধ্যে বিয়ে হওয়াটা বেশ সাধারণ ব্যাপার ছিল, কারণ তখন কোনো কাঁটাতারের বেড়া ছিল না।

জব্বারের জন্ম ১৯৯০ সালে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন অনুযায়ী, ১৯৫০ সালের পর এবং ২০০৩ সালের আগে ভারতে জন্মগ্রহণকারী যেকোনো ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন, যদি তার বাবা বা মায়ের মধ্যে যেকোনো একজন ভারতীয় হন—এবং অপরজন যদি অবৈধ অভিবাসী না হন।

জামিরুল জানান, আট বছর বয়স পর্যন্ত জব্বার লক্ষ্মীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতে তার নানা-নানির বাড়িতে বড় হয়েছে। ‘গত ২৬ বছর ধরে সেওআমাদের সাথেই আছে। ও যে ভারতীয়, তা প্রমাণ করার কোনো সুযোগই আমাদের দেওয়া হয়নি।’

জব্বারকে আটক করার কয়েকদিন পর তার ২৬ বছর বয়সি স্ত্রী জুম্মান বিবিকে জঙ্গিপুরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

জুম্মানের ভাই নবীনুল হক বলেন, ‘খিঁচুনি হওয়ার পর সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। এরপরই ওকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ও বারবার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। ওর দুই ছেলেও নিখোঁজ।’

জুম্মান স্ক্রলকে জানান, পুলিশ তাকে বলেছে, জব্বার ও তার সন্তানদের বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হয়েছে। ‘সর্বশেষ গত ২৮ আগস্ট ওর [জব্বা] সাথে আমাদের কথা হয়েছিল। তখন সে আহিরন ডিটেনশন সেন্টারে ছিল।’

আটকের ২০ দিন পর এফআইআর

গত ১৪ জুন মধ্যরাতে মুর্শিদাবাদ পুলিশ বুধের কিসমত গ্রামের ২৮ বছর বয়সি বাসিন্দা সাহিন শেখকে তুলে নিয়ে যায়।

তার স্ত্রী আমিনা খাতুন বলেন, ‘আমরা দরজা খোলার পর পুলিশ সাহিনকে প্রশ্ন করতে শুরু করে। তারা ওর বাবা ও দাদার নাম জানতে চায়। তারা দাবি করে, ও বাংলাদেশি নাগরিক।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার স্বামী জানিয়েছিল, ওর জন্ম এখানেই, সারা জীবন এখানেই কাটিয়েছে।’ তিনি থানায় ২০০৩ সালের জমির দলিল ও রাজ্য সরকারের দেওয়া রেশন কার্ডসহ বিভিন্ন কাগজপত্র জমা দিলে পুলিশ সেগুলো গ্রহণ করেনি।

এ বছর এসআইআরের সাহিন শেখের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তবে নির্বাচন কমিশন গঠিত আপিল ট্রাইব্যুনালে নাম বাদ পড়ার বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেছেন।

সাহিনকে লালগোলা ডিটেনশন সেন্টারে নেওয়া হয়। আমিনা জানান, এরপর থেকেই পুলিশ তাকে বাংলাদেশে পুশব্যাক করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতেও পুলিশ কয়েক সপ্তাহ সময় নেয়।

সাহিনের আইনজীবী মোহাম্মদ আবু রায়হান স্ক্রলকে জানান, তাকে বাংলাদেশে পুশব্যাক করতে না পেরে পুলিশ ২০ দিন পর, গত ৬ জুলাই একটি স্বপ্রণোদিত এফআইআর দায়ের করে। ‘এটি সম্পূর্ণ বেআইনি। পুলিশের এফআইআরে বলা হয়েছে, কোনো এক সূত্রের মাধ্যমে তারা জানতে পেরেছে তিনি বাংলাদেশি।’

স্ক্রলের দেখা সেই স্বপ্রণোদিত এফআইআর অনুযায়ী, পুলিশ অভিযোগ করেছে, সাহিনের ব্যাগ তল্লাশির সময় বাংলাদেশের একটি জন্মনিবন্ধন সনদের ফটোকপি পাওয়া যায়, যা তার বাংলাদেশি যোগসূত্রের ইঙ্গিত দেয়। তবে রায়হান বলেন, ‘এই নথি আসল বলে প্রমাণিত হয়নি।’

রায়হানের অভিযোগ, পুলিশ জন্মসনদ ও অন্যান্য কাগজপত্র যাচাই না করায় পুরো মামলাটিই ‘মিথ্যা ও বানোয়াট’ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সাজানো হয়েছে। ‘আমি আদালতকে সাহিনের ভোটার কার্ড, পঞ্চায়েত সনদ, স্কুলের সনদ ও জমির দলিল যাচাই করার অনুরোধ জানিয়েছি। নির্বাচন কমিশন ও মুর্শিদাবাদ জেলা প্রশাসন এগুলো যাচাই করে তারাই বলুক এসব নথি ভুয়া কি না।’

‘যাকে খুশি, তাকেই তুলে নিচ্ছে পুলিশ’

মুর্শিদাবাদের আইনজীবী শাহিন মণ্ডল বলেন, এ ধরনের বেশ কয়েকটি ঘটনায় পুলিশের পদক্ষেপ সমস্ত সাংবিধানিক বিধান লঙ্ঘন করেছে। ‘বর্তমান সরকারের নির্দেশে পুলিশ যাকে খুশি, তাকেই তুলে নিচ্ছে।’

গত ২৬ জুনের রাতে শাহিনের মক্কল জীবন শেখকে তুলে নিয়ে যায় মুর্শিদাবাদ পুলিশ। শাহিন বলেন, ‘ভোটার কার্ড থেকে শুরু করে স্কুলের সনদপত্র—সব কাগজপত্রই তার আছে। কিন্তু পুলিশ সেগুলো নেয়নি। এসআইরে নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে তিনি ভোটও দিয়েছেন।’

তারপর থেকেই জীবনের ২৭ বছর বয়সি স্ত্রী ফরিদা বিবি তাকে লালগোলার একটি হোল্ডিং সেন্টার থেকে মুক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ফরিদা বলেন, ‘ওর কাছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দেওয়া পরিচয়পত্রও আছে। তাতে ওকে মৎস্য ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপরও তারা ওকে ধরে নিয়ে গেছে।’

ফরিদা জানান, গত তিন মাসে সংসার চালাতে গিয়ে তার সঞ্চয়ের সব টাকা শেষ হয়ে গেছে। এই দম্পতির তিন সন্তান রয়েছে; বড় জনের বয়স ১৩ বছর।

জীবনের পক্ষে লড়াই করা অন্যতম আইনজীবী সেলিম শেখ স্ক্রলকে বলেন, দুই মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও পরিবারকে এফআইআরের কোনো কপি বা অন্য কোনো আদেশনামা দেওয়া হয়নি, যা সাংবিধানিক বিধানের লঙ্ঘন। ‘তার এই আটকের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে আমরা কলকাতা হাইকোর্টে যাচ্ছি।’

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন